:

ভোটের রাজনীতিতে নানা সমীকরণ: কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপি

top-news

আর মাত্র কয়’দিন পরেই বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের এই নির্বাচন হচ্ছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। ২৪’ গণ আন্দোলনে ১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই নির্বাচনে। সরকারের নির্বাহী আদেশে দেশের প্রাচীনত এই দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারই অনুষ্ঠিত হচ্ছে আওয়ামীলীগ বিহিন নির্বাচন। এই  নির্বাচকে নিয়ে দেশ বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম নানাভাবে বিশ্লষেন করছেন। স্থানীয় ভাবেও চলছে চুলছেড়া বিশ্লষেণ। 


ভোটের রাজনীতিতে আলোচনা চলছে নানা সমীকরণ নিয়ে। তবে, এক কথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, আওয়ামীলীগ বিহীন নির্বাচনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে  পড়তে যাচ্ছে, দীর্ঘ ১৬ বছর ভোটের দাবিতে রাজপথ থেকে বিএনপি। ৫ আগষ্টের পট পরিবর্তনের পর বিএনপি যতটা সহজ ভাবে ভেবে নিয়ে ছিল তারা ক্ষমতায় যাচ্ছে বাস্তবে পরিস্থিতি তেমন নেই। বিএনপি’র অগ্রযাত্রকে চ্যালঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী। দলটি এখন ক্ষমতার অন্যতম দাবিদার।

এদিকে রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হবে। দলটি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বিএনপির চেয়ারম্যান ধ্বস নামানো বিজয়ের আশাবাদ করলেও বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, জামায়াত-এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় জোটের কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে যাচ্ছে দলটি। রয়াটার্সকে দেয়া সাক্ষাতকারে জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার গঠনের কথা নাকচ করে দিয়ে এককভাবে সরকার গঠনের আভাষ দিয়েছেন।

নির্বাচনী বিশ্লেষনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কুমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী ফেনী, লক্ষ্মীপুর বিএনপি’র দুর্গ হিসাবে পরিচিতি ছিল। ১৯৯১, ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এসব জেলায় নিজের দুর্গ অক্ষুন্ন রাখতে পারলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সেই দুর্গে হানা দিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। জামায়াত চট্টগ্রামে একটি এবং কক্সবাজারে একটি আসন ধরে রাখতে পেরে ছিল।

ফলাফল বিশ্লেষনে দেখা যাচ্ছে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন আসনের বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের ভোট ছিল  ৪০-৪৩শতাংশ। অপরদিকে আওয়ামীলীগের ভোট ছিল ৩৫ থেকে ৩৮শতাংশ। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোট ৪৬ থেকে ৫০শতাংশ, আওয়ামীলীগ ৩৭ থেকে ৪০শতাংশ ভোট পেয়েছিল।

২০০৮ সালের নির্বাচনে এসে সব উলট পালট হয়ে যায়। আওয়ামীলীগের নেতৃাধীন মহাজোট ৫৮ থেকে ৬২শতাংশ এবং বিএনপি ৩৫থেকে ৩৮শতাংশ। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন বিএনপি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে?

জাতীয় এবং  আর্ন্তজার্তিক গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষনে দেখা যাচ্ছে,  ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধারণা করা হচ্ছিল, আগামী নির্বাচনে বিএনপির একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই দৃশ্যপটে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষন বলছে, বিএনপি এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষ করে নিজেদের নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকান্ড এবং দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর কৌশলগত উত্থান দলটিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

আর্ন্তজাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্ষমতার পালাবদলের পরপরই দেশের অনেক স্থানে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বাজার দখল, পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি এবং প্রতিপক্ষের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের অভিযোগ ওঠে।
‘মামলা বাণিজ্য’ শব্দটি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির এক শ্রেণির নেতাকর্মী প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নামে ঢালাও মামলা করেছেন এবং পরবর্তীতে টাকার বিনিময়ে নাম কাটানোর বা সমঝোতার নামে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।

সাধারণ মানুষ, যারা ২৪’র গণআন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিল, তারা এই ধরণের অরাজকতা মেনে নিতে পারেনি। ফলে ৫ আগস্টের পর বিএনপির প্রতি যে জনসমর্থনের জোয়ার ছিল, তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে।

এদিকে, দীর্ঘদিন রাজনীতিতে কোণঠাসা এবং অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ থাকার পর, ৫ আগস্টের পর জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত ধীরস্থির ও সুশৃঙ্খলভাবে নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত খুব কৌশলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলিতে নিজেদের মতাদর্শের বা সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের পদায়নে কাজ করেছে। এটি আগামী নির্বাচনে তাদের জন্য বড় অ্যাডভান্টেজ হিসেবে কাজ করতে পারে।

বিএনপির তুলনায় জামায়াত মাঠপর্যায়ে সহিংসতা কম প্রদর্শন করেছে এবং ত্রাণ ও সেবামূলক কাজের মাধ্যমে নিজেদের ‘উদার ও মানবিক’ ভাবমূর্তি গড়ার চেষ্টা করেছে।

আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক ও জামায়াতের ‘নমনীয় কৌশল’

নির্বাচনী রাজনীতির সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা দিচ্ছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংকের গতিপথ। ৫ আগস্টের পর বিএনপির নেতাকর্মীদের হাতে আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মীরা যেভাবে হামলা ও মামলার শিকার হয়েছে, তাতে তারা বিএনপির প্রতি চরমভাবে বিরাগভাজন।

অন্যদিকে, জামায়াত অনেক এলাকায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রতি নমনীয় আচরণ করেছে। বিশ্লেকরা বলছেন, এটি জামায়াতের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল। তারা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের নিরাপত্তা বা ‘সফট কর্নার’ দেখিয়ে তাদের ভোট নিজেদের বাক্সে টানার চেষ্টা করছে।

ফলস্বরূপ, স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক এখন বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াতকে সমর্থন দিচ্ছে। রাজনৈতিক টিকে থাকার স্বার্থে ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ নীতিতে আওয়ামীলীগের তৃণমুল পর্যায়ের সমর্থকরা জামায়াতকে বেছে নেয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে বলে স্থানীয় ভাবে প্রচারিত হচ্ছে। 

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং পেশাজীবী সংগঠনের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর ফলাফল বা প্রবণতা এই বিশ্লেষনের সত্যতা নিশ্চিত করে। ছাত্র রাজনীতিতে এবং স্থানীয় নির্বাচনে দেখা গেছে, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বিরোধী পক্ষগুলো বিএনপির ছাত্র সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। সেখানে বিকল্প শক্তি হিসেবে যারা দাঁড়াচ্ছে, তা জামায়াতপন্থী ছাত্রসংগঠন হোক বা স্বতন্ত্র জোট, তারা আওয়ামী ঘরানার বা এন্টি-বিএনপি ভোটগুলো সহজেই নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আগামী নির্বাচন বিএনপির জন্য যতটা সহজ ভাবা হয়েছিল, বাস্তবতা ততটা মসৃণ নয়। একদিকে দলের আভ্যন্তরী শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অন্যদিকে জামায়াতের এই নতুন রাজনৈতিক কৌশলের মোকাবিলা করা এই দ্বিমুখী সংকট কাটাতে না পারলে ভোটের মাঠে বিএনপিকে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। সব কিছু যানা যাবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে ফলাফল কোন দিকে যায়। 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *